সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা আহত হলে সরকারের পক্ষ থেকে কী কী আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়
বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজারের বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় প্রায় ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার মানুষ নিহত হন এবং ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬,৪৭৬ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে আরেকটি যাত্রীকল্যাণভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন।
২০২৪ সালেও প্রায় একই চিত্র ছিল। ওই বছরে ৬,৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮,৫৪৩ জন নিহত এবং ১২,৬০৮ জন আহত হন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে বা গুরুতর আহত হলে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেকেই এই সুবিধার কথা জানেন না। ফলে দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।
বর্তমানে বা BRTA-এর মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এই সহায়তা দেওয়া হয় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে।
কারা এই সহায়তা পাবেন
সড়ক দুর্ঘটনায়—
- কেউ মারা গেলে তার পরিবার
- কেউ গুরুতর আহত হলে
- কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বা অঙ্গহানির শিকার হলে
- কেউ সাময়িকভাবে আহত হলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে
এই সহায়তা পাওয়ার জন্য দুর্ঘটনাটি সড়কে সংঘটিত হতে হবে এবং এ বিষয়ে পুলিশ রিপোর্ট থাকতে হবে।
কত টাকা পাওয়া যায়
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী—
- নিহত ব্যক্তির পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা
- গুরুতর আহত বা অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তি পাবে ৩ লাখ টাকা
- সাধারণ আহত ব্যক্তি পাবে ১ লাখ টাকা
যদি কেউ দুর্ঘটনায় স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারেন, সেক্ষেত্রেও ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যায়। আর যদি চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়।
কীভাবে আবেদন করতে হবে
দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যকে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। সাধারণত এই আবেদনটি BRTA-এর Form-32 এর মাধ্যমে করা হয়।
আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলা BRTA অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অথবা অনলাইনে BRTA-এর সেবার মাধ্যমে আবেদন করা যায়। আবেদন জমা দেওয়ার পর ট্রাস্টি বোর্ড বিষয়টি যাচাই করে এবং অনুমোদন দিলে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান করা হয়।
কী কী কাগজপত্র লাগবে
আবেদনের সময় সাধারণত নিচের কাগজগুলো প্রয়োজন হয়—
- দুর্ঘটনার বিষয়ে থানায় করা GD বা FIR-এর কপি
- হাসপাতালের কাগজপত্র, চিকিৎসার রিপোর্ট ও বিল
- আহত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ
- নিহত হলে মৃত্যু সনদ
- উত্তরাধিকার সনদ বা ওয়ারিশ সনদ
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- ব্যাংক হিসাবের তথ্য
যদি দুর্ঘটনায় গাড়ি শনাক্ত করা যায়, তাহলে পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণও দাবি করা সম্ভব।
কত দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে
আগে দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হতো। তবে বর্তমানে সরকার এই সময়সীমা বাড়িয়ে ৯০ দিন করেছে। ফলে দুর্ঘটনার পর তিন মাসের মধ্যে আবেদন করলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
টাকা পেতে কত সময় লাগে
সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি হয়। তবে কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে বা পুলিশ রিপোর্ট না থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
অনেক সময় জেলা প্রশাসন ও BRTA যৌথভাবে ভুক্তভোগীদের হাতে চেক তুলে দেয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে নিহত ও আহতদের পরিবারকে লাখ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ
সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিচের সুযোগগুলোও পাওয়া যেতে পারে—
- গাড়ির বীমা থাকলে ইনস্যুরেন্স দাবি
- আদালতের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ মামলা
- শ্রমিক বা চাকরিজীবী হলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ
- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তা
- স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা জেলা প্রশাসনের জরুরি অনুদান
সচেতনতা জরুরি
অনেক মানুষ এখনো জানেন না যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়। তাই দুর্ঘটনার পর যত দ্রুত সম্ভব থানায় অভিযোগ, হাসপাতালের কাগজপত্র সংগ্রহ এবং BRTA-তে আবেদন করা জরুরি।
সঠিক সময়ে আবেদন করলে একটি পরিবার বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পেতে পারে, যা দুর্ঘটনার পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতিতে অনেকটাই সহায়ক হতে পারে।
সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দ্রুত কীভাবে পাওয়া যায়
১. দুর্ঘটনার পর আগে থানায় GD বা FIR করতে হবে।
২. হাসপাতালে ভর্তি হলে সব রিপোর্ট, ছাড়পত্র, বিল, চিকিৎসার কাগজ সংরক্ষণ করতে হবে।
৩. নিহত হলে মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে।
৪. এরপর অফিস থেকে বা অনলাইনে ক্ষতিপূরণের আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে। সাধারণত Form-32 ব্যবহার করা হয়।
৫. আবেদন ফরমের সাথে নিচের কাগজগুলো জমা দিতে হবে—
- GD বা FIR কপি
- হাসপাতালের রিপোর্ট
- NID বা জন্মসনদ
- মৃত্যু সনদ (যদি নিহত হন)
- ওয়ারিশ সনদ
- আবেদনকারীর ছবি
- ব্যাংক হিসাব নম্বর
- ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি করপোরেশনের প্রত্যয়নপত্র
৬. সব কাগজ জেলা অফিসে জমা দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকেও জমা নেওয়া হয়।
৭. এরপর পুলিশ রিপোর্ট, হাসপাতালের তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করা হয়।
৮. যাচাই শেষে ট্রাস্টি বোর্ড অনুমোদন দিলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয় বা চেক দেওয়া হয়।
৯. দুর্ঘটনার ৯০ দিনের মধ্যে আবেদন করলে সবচেয়ে ভালো হয়।
১০. কাগজপত্র ঠিক থাকলে সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যে টাকা পাওয়া যায়।




0 মন্তব্যসমূহ
Thank you for feedback